হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, মসজিদে আহলে বাইত (আ.), কুমারপুর, মেদিনীপুর, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত। মসজিদে আহলে বাইত (আ.) এ জুমার খুতবায় হুজ্জাতুল ইসলাম মাওলানা মুনির আব্বাস নাজাফি মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন, চরিত্র ও রিসালাতের বিভিন্ন দিক নিয়ে গভীর ও প্রাণবন্ত আলোচনা করেন।
কোরআনের আয়াতের ব্যাখ্যা
মাওলানা নাজাফি তাঁর বক্তব্যের শুরুতে পবিত্র কোরআনের সূরা আম্বিয়ার ১০৭ নম্বর আয়াত "وما ارسلناك الا رحمه للعالمين" (আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য রহমতরূপেই প্রেরণ করেছি) উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এই আয়াতের মাধ্যমেই আল্লাহ পাক স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে সারা দুনিয়ার জন্য রহমত করে পাঠানো হয়েছে। শুধু মুসলমানদের জন্য নয়, বরং সমগ্র মানবজাতি, জিন জাতি, এমনকি সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্যই তিনি রহমত।

নবীর ৪০ বছরের চরিত্র ও সত্যনিষ্ঠতা
মাওলানা নাজাফি বলেন, মহানবী (সা.) নবুওয়াত লাভের আগে ৪০ বছর পর্যন্ত মক্কার মানুষের মাঝে বসবাস করেন। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি কখনো মিথ্যা বলেননি, কখনো কারো সাথে প্রতারণা করেননি। তাঁর সত্যবাদিতা ও আমানতদারিতার কারণে মক্কাবাসী তাকে 'সাদিক' (সত্যবাদী) ও 'আমিন' (বিশ্বস্ত) উপাধিতে ভূষিত করেছিল। এমনকি তাঁর শত্রুরাও তাঁর চরিত্রের প্রশংসা করতে বাধ্য হতো।
নবুওয়াত ঘোষণা ও প্রতিক্রিয়া
তিনি আরও বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বয়স ৪০ বছর হয়, তখন তিনি নবুওয়াত লাভ করেন এবং প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন-'তোমরা সবাই লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পড়ো, বিভিন্ন মিথ্যা উপাস্যকে ত্যাগ করো এবং এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহকে মেনে নাও।' কিন্তু এই ঘোষণার পর মক্কার কাফের ও মুশরিকরা তাঁর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। তারা তাকে কটুক্তি করতে থাকে, মিথ্যা অপবাদ দেয়, তাকে পাগল ও জাদুগ্রস্ত বলে আখ্যা দেয়।

তবলীগের পথে বাধা-বিপত্তি
মাওলানা নাজাফি নবী (সা.)-এর তবলীগের পথে আসা প্রতিকূলতার বিস্তারিত বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, কেউ কেউ রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পথে পাথর ছুঁড়ে মারত, কেউ তার রাস্তায় কাঁটা বিছিয়ে দিত, কেউ উটের নাড়ি-ভুঁড়ি তার পায়ে ফেলে দিত। এমনকি তায়েফের বাসিন্দারা তাকে পাথর মেরে রক্তাক্ত করে দিয়েছিল। কিন্তু তিনি সব ধৈর্য সহকারে সহ্য করেছেন এবং কখনো প্রতিশোধ নেননি।
সাহায্যকারীর প্রার্থনা ও আলী (আ.)-এর আগমন
বক্তা বলেন, এক সময় রাসূলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর দরবারে হাত তুলে প্রার্থনা করলেন-'হে আল্লাহ! আমার জন্য একজন সাহায্যকারী প্রেরণ করুন।' আল্লাহ পাক সেই প্রার্থনা কবুল করেন। ১৩ই রজব, পবিত্র কাবা শরীফের অভ্যন্তরে এক ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটে। আল্লাহ পাক রাসূলুল্লাহর কোলে একটি শিশুকে দান করেন, যার নাম ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা-আলী ইবনে আবি তালিব (আ.)।
মাওলানা নাজাফি আরও বলেন, হযরত আলী (আ.) শৈশব থেকেই রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গী হন। তিনি কখনো তার চাচাতো ভাই ও জামাতা হিসেবে নয়, বরং একজন অনুগত সাহাবী, একজন সাহসী যোদ্ধা ও একজন বিশ্বস্ত সহায়ক হিসেবে রাসূলকে সাহায্য করেছেন। তিনি নিজের জান ও প্রাণ দিয়ে রাসূলের পাশে দাঁড়িয়েছেন। লাইলাতুল মাবিতের রাতে যখন রাসূলের প্রাণনাশের ষড়যন্ত্র হয়েছিল, তখন আলী (আ.) তার নিজের জীবন বাজি রেখে রাসূলের বিছানায় শুয়েছিলেন। বদর, উহুদ, খন্দকসহ প্রতিটি যুদ্ধে তিনি রাসূলের পাশে ছিলেন।

বক্তব্যের শেষাংশ
মাওলানা নাজাফি তাঁর বক্তব্য শেষে বলেন, আমাদের উচিত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শকে নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করা এবং হযরত আলী (আ.)-এর মতো সাহস, ত্যাগ ও নিষ্ঠা অর্জন করা। ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা হলো মানবতার সেবা করা, সত্যের পথে চলা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো।

উপসংহার
মসজিদে আহলে বাইত (আ.), কুমারপুরের এই জুমার খুতবায় উপস্থিত মুসল্লিদের জন্য এক আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও প্রশান্তির উৎস হয়ে থাকে। মাওলানা মুনির আব্বাস নাজাফির বক্তব্য ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে জীবন্ত ও অর্থবহ করে তুলেছে এবং নবী (সা.) ও হযরত আলী (আ.)-এর সম্পর্কের গভীরতা ও তাৎপর্যকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।
আপনার কমেন্ট